06 November, 2009

ভূজহীন আকার-আকৃতি




........................
-এত্তগুলো হলুদ ফুল ফুটলো কবে?!
তুমি অবাক বিষ্ময়ে অনেকটা চিৎকার করে উঠো। দৌঁড়ে আসি।
-ওওও, ওগুলো? প্রতিদিনই ফুটে। সকালের দিকে ফুটে আর সন্ধ্যায় মিলিয়ে যায়। রোদ উঠলে পুরো বারন্দাটা একদম হলুদ হয়ে থাকে।
তুমি বিশ্বাসই করতে চাওনা।
-যাহ! আমি কখনো দেখলাম না যে?
আমি হাসি। ও প্রশ্নের কোনো উত্তর হয়না বলেই হাসিটাকে একধরনের উত্তর বানানো। তুমি অবাক হয়ে হলুদ ফুলগুলো স্পর্শ করে করে দেখলে। আমি আমার দু’হাতের বেলুনের নীচে রুটির আকৃতিটাকে গোল বানানোর প্রানান্ত চেষ্টা করি। একসময় আম্মু গোল গোল করে রুটি বানাতো। ছোট ছোট সেই আটার রুটি ছ্যাৎ ছ্যাৎ করে ভাজা হত গরম তাওয়ায়। আব্বু আরাম করে পত্রিকা পড়তে পড়তে খেতেন। অথবা তারো আগে নানুর হাতে নিজ বাড়িতে তোলা আসল ঘিয়ে ভাজা গরম গরম পরটা খেতেন জমিদার বংশের শেষ প্রদীপ নানা। নানাবাড়ির সামনের সেই শানদার কাঠের চেয়ারে বসে উঠানে খেটে খাওয়া কামলাদের খোঁজখবর নিতে নিতে নানা শুনতে পেতেন সেই গরম পরটা ভাজার শিইইইইইত আওয়াজ। আর বাতাসে ভাসতো কাঁচা ঘিয়ের ঘ্রান।
বারান্দা থেকে তোমার গলা ভেসে আসে, ‘হলুদ ফুলগুলো অদ্ভূদ সুন্দর!’
আমি রুটিতে মন দিতে চেষ্টা করি। নানু আর আম্মু’দের সময় পেরিয়ে আমাতে এসে রুটিরা কেন যেন তাদের আকৃতি হারিয়ে ফেলেছে। যতবার রুটি বানাতে যাই, গোলাকৃতি ছেড়ে ময়দার দলাটা তত অষ্টভূজ আকৃতি নিতে থাকে। অথবা অনেক সময় ভূজ-হীন, আকৃতিবিহীন।
তুমি হলুদ ফুলের উচ্ছাস কাটিয়ে তখন ক্ষুধার্ত। আমার রুটিরা তখনো আকৃতি পায়নি। বারান্দা থেকে তাই একটা হলুদ ফুল ছিঁড়ে এনে ময়দার দলাটাতে সুন্দর করে গেঁথে দেই। দেখতে অসাধারন লাগে। তোমার ভীষন অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলি- ‘ফুলগুলো আসলেই বেশ সুন্দর’।

28 October, 2009

বাতাস, ক্যাপ, পিচচি, মহিলা, বৃদ্ধ এবং আমি




.....................
কনকনে সুঁই ফোটানো ঠান্ডা বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। শালার ঠান্ডা যত না, তার চে’ হাজার গুনের বেশী বাতাসের ধাক্কা। ভোর বেলা, মানুষ জন তেমন বেশী না। যারা আছে তারা বেশীরভাগই শিউর কামলা দিতে যাচ্ছে। নতুবা উইকেন্ডের এই তীব্র বাতাসের ভোরে কারো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই কম্বলের তলা থেকে বের হবে। বাতাসের ধাক্কায় শেষে যখন উড়ে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্যে রাস্তার পাশের খাম্বা আঁকড়ে ধরবো কিনা ভাবছি, তখন পিচ্চিটাকে দেখলাম। তার মা শক্ত করে দাঁড়ায়ে আছে পিচচির হাত ধরে। আর পিচ্চি তার মায়ের হাত আঁকড়ে মায়ের পিছনে ঠেসে আছে। মা সামনে না থাকলে হান্ড্রেড পার্সেন্ট পিচচিটা উড়ে যাবে! এই ভোরে মা-বাচ্চা যায় কোথায় কে জানে। উইকেন্ড, স্কুল তো বন্ধ।

বাতাসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে হাঁটি। স্টেশন যেতে সাত মিনিট লাগে। মাত্র অর্ধেক এসেছি, কিন্তু এর মধ্যেই মেরুদন্ডে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। ঠান্ডায় এই এক সমস্যা, মেরুদন্ড টন টন করতে থাকে। রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে সবুজ লাইটের জন্যে দাঁড়ালাম। পিচচি তার মাকে আঁকড়ে আমার পাশে। তখনই ঘটনা টা ঘটল। আমাদের সাথে এসে দাঁড়িয়েছেন এক বৃদ্ধ। ঠান্ডা থেকে বাঁচতে মাংকি ক্যাপের উপর আরেকটা বেইসবল ক্যাপ পড়া। বাতাসের ধাক্কা একটু কমায় শরীর মাংসপেশীগুলোকে একটু মাত্র রিল্যাক্স করেছি, তখনি প্রবল ধাক্কাটা আবার এলো। আক্ষরিক অর্থেই কানের কাছে শো শো করছে। বৃদ্ধ কিছু বুঝে উঠার আগেই বেইসবল ক্যাপ শাঁইই করে উড়ে গেল! বৃদ্ধ হাত উঠিয়েছিলেন ক্যাপটা ধরতে কিন্তু ধরতে পারলেন না। ক্যাপটা উড়ে গিয়ে পড়ে আবার বাতাসের ধাক্কা খেতে খেতে সামনে এগুচ্ছে। মা কিছু বুঝে উঠার আগেই বাচ্চাটা দৌঁড় দিল ক্যাপটা ধরতে। বাচচাটা ধরার আগেই বাতাস ক্যাপ উড়িয়ে আরো দু’কদম আগে নিয়ে আঁছড়ে ফেলে। ক্যাপ ধরতে গিয়ে বাচ্চা না আবার রাস্তায় গিয়ে পড়ে, মধ্য বয়স্ক স্থুল দেহের মা’র অসহায় চেহারা দেখে আমি বাচচাকে ধরতে যাই। এবার দু’জন মিলে ক্যাপের পিছে দৌঁড়! হাত দিয়ে মাত্র ছুঁয়েছি ক্যাপটা, আরেক বাতাসের ধাক্কায় ক্যাপ একদম রাস্তার মাঝখানে। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই ভারী জিপ এসে চ্যাপ্টা করে দিয়ে গেল ক্যাপটা!

হতভম্ব আমি বাচ্চার দিকে তাকাই। বাচ্চা আমার দিকে তাকায়। আমরা মা আর বৃদ্ধ’র দিকে তাকাই। এবং আমাদের সবাইকে আরো হতভম্ব করে দিয়ে বৃদ্ধ হো হো করে হেসে উঠেন!

সবুজ লাইট জ্বলে উঠলে রাস্তার মাঝখান থেকে চ্যাপ্টা ক্যাপটা উদ্ধার করে, বৃদ্ধ, আমি এবং মা ও তার পিচচি, আমরা অচেনা চারজন হাসতে হাসতে রাস্তা পার হই।

স্টেশনে যেতে যেতে ঠান্ডা বাতাসের সুঁই ফোটানো ধাক্কাটাকে তেমন খারাপ লাগলো না আর।

17 October, 2009

ইউ ক্রেজী!


যে আমি আকাশ দেখতে প্রচন্ড ভালবাসি, উঁহু, খোলা আকাশের নীচে দাঁড় করিয়ে দিলে তখন ভাললাগেনা। হয়তো একটু গাছের আড়াল থাকতে হবে, অথবা জানালার ফ্রেম। গাছের লুকোচুরি, অথবা জানালার বন্দীত্ব আকাশকে কেমন যেন অন্যরকম একটা অর্থ দেয়। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, যে আমি প্রচন্ড আকাশ ভালবাসি, যে আমি যেখানেই আকাশ দেখতে পারা জানালা পেলে সাথে সাথে সে জানালার প্রেমে পড়ে যাই, যে আমি বিয়ের অনেক শর্তের মধ্যে ছোট্ট একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিলাম জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে পারা রুম, সে আমিই শেষ পর্যন্ত এমন জায়গায় ডেস্কটা পেলাম, আকাশতো দিল্লী সমান দূর, বাতাসেরও কোনো গন্ধ নেই! উঁহু, এক ফোঁটা বাড়িয়ে বলছিনা। বাতাশ শুদ্ধিকরন কৃত্রিম পদ্ধতি আর তাপনিয়ন্ত্রন কারিশমার বদৌলতে রুমের ভিতরের বাতাস পুরোই কেমন যেন অচেনা। করিডোরের পর করিডোর ঘুরে বিল্ডিং’র বাইরে বের না হয়ে আসলে ঘুনাক্ষরেও বুঝার উপায় নেই- এখন বৃষ্টি না রোদ, সকাল না রাত! চোখের জন্যে প্রয়োজনীয় এবং সহনশীল মাত্রায় সেট করে রাখা বৈদ্যুতিক আলো থেকে শুরু করে, না শীত না ঠান্ডা তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রন বারে বারে আমাকে সলিমা সিরাজের পাঁচতলায় সিঁড়ির পাশের রুমটায় প্রচন্ড গরমে ঘামতে ঘামতে এগারটা মেয়ের অংক করতে করতে জান বের হয়ে যাওয়ার অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। আপাও ঘামতেন। ঘামতে ঘামতে হাত থেকে পিছলে চক পড়ে যেত। আপার হাতের চকের মত আমার এখন বার বার মন পিছলায়। মনের সাথে সাথে চোখ। একটূ পর পর চোখ পিট পিট করি। অলরেডী দেশে গিয়ে ‘থিঙ্কস টু ডু’ এর তালিকায় প্রথমেই দাঁতের ডাক্তারের পরে চোখের ডাক্তার দেখানো লিষ্টি করা হয়ে গেছে। সন্দেহ নেই, ক’দিনেই চার চোখ দিয়ে বিশ্বদর্শন শুরু হবে। খানিক পর পর করিডোর ঘুরে ঘুরে বের হয়ে আসি। গাছের নীচের বেঞ্চে বসে থাকি। ইচ্ছে করে পুরো ডেস্কটাই এই গাছের নীচে নিয়ে আসি।

রুমের ভিতরের হাতে গোনা রাশভারি মানুষগুলোর মধ্যে একমাত্র সৌদি’র রাশাই আমার কাছকাছি বয়সের। রাইটিং সার্কেলে যখন এই বিশাল মাপের মানুষগুলো হড়বড় করে কথা বলে আমি আর রাশা তখন হাতের নখ অথবা কলমের ডগা দাঁত দিয়ে কামড়াই। চা খাওয়ার নাম করে বের হয়ে একজন আরেকজনের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি ‘তুমি কী বুঝেছো?’
তারপর দু’জনের বুঝাবুঝি ভাগাভাগি করে হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসি সব অবুঝ মানুষদের মিটিং-এ। এবং পুনরায় দাঁত দিয়ে নখ খাওয়া। আমাদের দু’জনকে অবশ্য একধরনের ‘দুধভাত’ ধরনের করে রেখে স্নেহ নিয়েই কথা বলেন ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলারা। তাই আমাদের এই দুই ‘দুধভাতে’ স্বাভাবিক বন্ধুত্ব। রাশা তার ডেস্ক চেইঞ্জ করে চেলে এসেছে আমার অপজিটের পাশের ডেস্কে।
তো রাশা একদিন না পারতে জিজ্ঞেস করে, ‘এতবার বের হও যে!’
হেসে বলি, ‘নিঃশ্বাস নিতে’!
ও এরমধ্যেই আমার ‘বিগড়ানো মাথা’র কিছুটা আইডিয়া পেয়ে গেছে। তাই কিছু না বুঝেই নিজের ডেস্কটপে মাথা ঘুরাতে ঘুরাতে বলে, ‘ইউ ক্রেজী’!
আমি বের হয়ে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বড় করে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেই।

পাগল হতে কখনোই আমার আপত্তি ছিলনা!